সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

সত্যজিতের জলসাঘর যেন আমাদের সবার জলসাঘর

জলসাঘর যেন সমাজ ও মানুষের গল্প।ছবিতে নিখাদ বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আমেজ দর্শককে অন্য এক জগতে পৌঁছে দিতে পারে অনায়াসেই।

মহিম গাঙ্গুলির ইট বোঝাই লরি ধূলোর স্রোতে আড়াল করে দিয়ে গেল এক সময়ের প্রতাপশালী জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের ঘোড়ার বহরকে।যে ঘোড়া এক সময় দুর্দান্ত গতিতে ছুটটো ,দাপিয়ে বেড়াতো।লরি কি শুধু ঘোড়াকেই ঢেকে দিয়ে গেল?সত্যজিতের এই ছোট্ট শর্টের বিষয়বস্তু শুধু ঘোড়া আর লরির মধ্যেই রাখা যেত।কিন্তু আমরা তা রাখতে চাই না।ছোট এই দৃশ্যই যেন আভাস দিচ্ছে নতুন এক যুগের। যে যুগের নাম যন্ত্র যুগ। যে সভ্যতার নাম যান্ত্রিক সভ্যতা।গ্রামের ধুলো মাখা পথে সর্বনাশা যন্ত্র সভ্যতার করাল থাবা।

তারাশঙ্করের উপন্যাস থেকে নির্মিত ‘জলসাঘর’ নিঃসন্দেহে সত্যজিতের সেরা কাজগুলোর একটি। সেই সঙ্গে বাণিজ্যিক ভাবেও যথেষ্ট সফল।
ছবির পুরো কাহিনীই আবর্তিত হয়েছে নখ দর্পণহীন জমিদার বিশ্বম্ভর বাবুর পতনের গল্পকে ঘিরে। জমিদার বেঁচে আছেন কিন্তু জমিদারি আর নেই। তবুও প্রচন্ড দাম্ভিক বিশ্বম্ভর রায় চূর্ণ হবেন না, বংশ আভিজাত্যের দম্ভকে টিকিয়ে রাখতে তাই তিনি বিসর্জনের নেশায় মেতেছেন। পুরো ছবিতেই সত্যজিৎ এই জমিদারের প্রতি একটু বেশিই মানবিক। যদিও সঙ্গীতের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা তাকে একজন শিল্প অনুরাগী মানুষ হিসেবেই চিনিয়েছে।

তাই দর্শকের চোখে তাঁর দম্ভ খুব একটা ধরা পড়ে না ,যেটা পড়ে সেটা হলো তাঁর আত্মমর্যাদা বোধ । তবে এই বোধের আতিসাজ্য তাঁর জন্য ডেকে আনে ভয়ংকর পরিনতি।একজন দাম্ভিক জমিদারকে মানবিক মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারার মাঝেই সত্যজিতের সার্থকতা। এখানেই সত্যজিৎ কালজয়ী। তাই বিশ্বম্ভর বাবুর করুন পরিনতিতে একজন মনোযোগী দর্শক হিসেবে আমাদের কাঁদতে হয়,তার প্রতি পরম সহানুভূতির দরজা খুলে দিতে হয়।
এখানে কোথাও কোথাও চরিত্রগুলোকে সত্যজিতের চেয়েও অধিক বলবান মনে মনে হতে পারে। এমনটার কারন ,তাদের চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যেতে পারা।

জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের ভূমিকায় ছিলেন ছবি বিশ্বাস ।সত্যজিতের বয়ানে ‘ছবি বাবুর মতো অভিনেতা না থাকলে ‘জলসাঘর’ কে চিত্রনাট্যে রূপ দেয়া সম্ভব হতো না’।তবে ছবির লোকেশন অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের যে জমিদার বাড়িতে শ্যুটিং হয়েছে সেটি বড্ড বেশিই নির্জন মনে হতে পারে। বিশ্বম্ভর বাবু ঠিক কোন এলাকার জমিদার সেটি বোঝার উপায় নেই। হয়তো পরিচালক চেয়েছিলেন জমিদারে জমিদারিকে প্রধান্য না দিয়ে বরং জমিদারের মনবিশ্লেষণ করা।
তবে সেই নব্য শহুরে ধাঁচে গড়া মহিম গাঙ্গুলির বাড়ি খানা দেখার আকুতি শেষ পর্যন্ত থেকেই যায় দর্শকের কাছে।

ছবির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক জমিদারিহীন জমিদারের প্রতি ভৃত্যদের অন্ধ আনুগত্য। যা তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।তাই জলসাঘর যেন সমাজ ও মানুষের গল্প।ছবিতে নিখাদ বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আমেজ দর্শককে অন্য এক জগতে পৌঁছে দিতে পারে অনায়াসেই। ওস্তাদ বেলায়েত খাঁয়ের সঙ্গীত পরিচালনাকে বেশ পরিমিত ও পরিশীলিত বলা যায়।আর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি সত্যজিত বরাবরই বেশ দুর্বল।সব মিলিয়ে অভিনয় নৈপুন্য,চিত্রনাট্য,সংলাপ আর তৎকালীন সমাজ বাস্তবতা সব কিছুর ভিতর দিয়ে জলসাঘর সত্যিই কালের সীমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই সত্যজিতের জলসাঘর আমাদের সবার জলসাঘর হয়ে উঠতে পেরেছে।
 


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।