সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

SAWTAL NEWS-Panchari Pic_. (4)-4.jpg

পাহাড়ের সাঁওতালদের জীবনযাত্রা যেমন চলছে

পাহাড়ের সাঁওতালদের জীবনযাত্রা
যেমন চলছে


রহমান মুজিব :

আনন্দপ্রিয় একটি জনগোষ্ঠী নাম সাঁওতাল সম্প্রদায়। বিভিন্ন পূজা পার্বন ও সামাজিক অনুষ্ঠানে নেচে-গেয়ে এরা খুশীতে থাকে মাতোয়ারা তাই প্রকৃতির সাথে তাদের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। এক যুগে গ্রাম বাংলার রাস্তা-ঘাট মেরামত, বনাঞ্চলে সামান্য চাষাবাস, বিভিন্ন পশুপাখি শিকার করে জীবন ও জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি জোতদারদের জমাজমি চাষ করাই ছিল তাদের প্রধান পেশা। পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার তিন গ্রামে বসবাসকারী সাঁওতাল সম্প্রদায়ে এসেছে বিপুল পরিবর্তন। এখন আর বাঁশ দিয়ে নিজ হাতে তৈরী তীর ধনুক দিয়ে বিভিন্ন শিকার ও বনে জঙ্গলে কাঠ পাতা সংগ্রহের দৃশ্য তেমন চোখে পড়েনা বললেই চলে।

পাহাড়ী জেলা খাগড়াছড়ির পানছড়িতে সাঁওতাল পাড়া নামে একটি পাড়া থাকলেও বর্তমানে গুটি কয়েক সাঁওতাল ছাড়া বাকীরা সবাই বাঙ্গালী সম্প্রদায়ের। তবে বর্তমানে কানুনগো পাড়া (সরেণ কার্বারীপাড়া) এলাকায় বেশীরভাগ সাঁওতাল সম্প্রদায় বসবাস করছে। এছাড়াও উপজেলা লোগাং ইউনিয়নের প্রদীপ পাড়ায় ২১ সাওতাল পরিবারের বাসবাস আছে। সব মিলিয়ে পানছড়ি উপজেলায় বর্তমানে ৭৩ পরিবারের ৩১৪ জন সাঁওতালের বসবাস। এর মাঝে পুরুষের সংখ্যা মহিলার চেয়েও অনেক কম। আর এদের নিয়ন্ত্রন করার জন্য রয়েছে তিন জন কার্বারী। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা ও অনুষ্ঠানাদিতে কার্বারীরাই নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।

আদিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর পোশাক পরিচ্ছেদ এক সময় ছিল নানা বৈচিত্রময়। পুরুষরা পড়তো লেংটি আর মেয়েদের ছিল বিচিত্র নকশার মোটা কাপড়ের দু’খন্ড বস্ত্র। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় কৃষিজীবি পুরুষরা পড়ছে ধুতি ও লুঙ্গি, মেয়েরা পড়ছে তাদের নিজস্ব ধারায় পেচানো শাড়ি আর শিক্ষিতদের মাঝে দেখা যায় পেন্ট-শার্ট পড়তে।

সরেজমিনে পানছড়ি সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সাথে বিভিন্ন জনের সাথে আলাপকালে জানা যায়, উদীয়মান ছেলে-মেয়েরা তাদের জীবন যাত্রার পরিবর্তন ঘটাতে সবাই স্কুলমুখী। এরই মাঝে এসএসসি ও এইচএসসি পাশের সংখ্যা প্রায় দশ‘র অধিক। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এখন বাঙ্গালীদের সাথে সাঁওতালী মেয়েদের বিয়েও হচ্ছে। তাও আবার প্রেমের বিয়ে। স্কুল-কলেজমুখী হওয়ায় ডিজিটাল সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে আজ তারা পাখি জামা ক্রয় থেকে শুরু করে কম্পিউটার চালনায়ও পারদর্শী বলে জানান সুজন সাওঁতাল।

সময়ের বিবর্তনে পানছড়ির সাওতালদের জবিনাচারে কিছুটা পরিবর্তন আসলেও অধিকাংশ পরিবারেরই স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। অনেকেই প্রাকৃতিক কাজ সারছেন বন-বাঁদাড়ে। সুপেয় পানীয় জলের সু-ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই ছড়া, কূয়া কিংবা নদীর পানির ওপর ভরসা করতে হয় তাদের। ফলে নিয়মিত রোগ-ব্যাধি লেগেই থাকে সাঁওতালীদের ঘরে ঘরে। অসচেতনতার কারণে স্থানীয় ওঝা-কবিরাজই তাদের একমাত্র ভরসা।

পানছড়ির কানুনগো পাড়া এলাকায় কয়েকজন আদিবাসী সাঁওতালের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আদিবাসী দিবস কি তা তারা জানেই না। তবে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, কোন এনজিও সংস্থা বা সরকারী প্রতিষ্ঠানের সু-নজরে না পড়ায় তারা আজও অবহেলিত বলে জানান। কৃষি কাজ ছাড়া তাদের আর কোন কাজ নেই। সারাদিন অন্যের জমিতে কৃষি কাজের বদলা দিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাতে চালাতে সারা বছরই অভাবের গøানি টানতে হয়। তাছাড়া খাবার পানির সংকট ও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত থাকার কথা বার বার তুলে ধরেন।

সদ্য এসএসসি পাশ করা পানছড়ি ডিগ্রী কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী লক্ষী হেমরাং জানান, অনেক কষ্ট করে লেখা-পড়া করতেছি। সেই কলেজ থেকে এসে জঙ্গল থেকে লাকড়ি এনে বিক্রি করেই পড়া-লেখার খরচ যোগাড় করি। কিন্তু ভবিষ্যতে একখানা সরকারী চাকুরী পাব কিনা সেই টেনশনে আছি। এদিকে বয়োবৃদ্ধ হিরজু সাওঁতাল ক্ষোভের সাথে জানালেন আমার বয়স এখন আশি। বয়স্ক ভাতার তালিকায় প্রতি বছর নাম নেয় কিন্তু আজো বয়স্ক ভাতা কি চোখে দেখি নাই।

এদিকে চন্দন হেমরাং, যীশু হেমরাং ও আকাশ মুরমু জানান, আমরা বিভিন্ন খেলাধুলা ও সংস্কৃতি থেকে বঞ্চিত একটি সম্প্রদায়। এখন কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের মধ্যেই ফুটবল খেলে থাকে সাওতালীরা। ববিষ্যতে বিভিন্ন টূর্নামেন্টে সাঁওতাল একাদশ নামে একটি দল অর্ন্তভুক্ত করার চিন্তা ভাবনার কথাও জানান কেউ কেউ।

পানছড়ির সংবাদকর্মী মো: মাহজাহান কবীর সাজু, জানান জাতি হিসাবে সাঁওতালরা খুবই পরিছন্ন এবং সমাজবদ্ধ। এরা থানা-পুলিশ, আইন-আদালত আর কোর্ট কাছারি সম্পর্কে কিছুই বোঝেননা। এদের বিভিন্ন বিচার-বিবাদ মানঝিহাড়াম (কার্বারী) মিমংাসা দিয়ে থাকে। মানঝিহাড়ামের বিচার ব্যবস্থা এদের কাছে দেবতার নির্দেশের মত। যেকোন উৎসব পালনেও নিতে হয় মানঝিহাড়ামের অনুমোদন।

সাওতালীদের মনঝিহাড়াম (কার্বারী) গুণ সরেণ জানান, তৎকালীন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কিছু সংখ্যক সাঁওতালদের রাস্তাঘাট মেরামত করার জন্য নিয়ে আসে। সেই সুবাদে তাদের পূর্ব পুরুষরা রাঙ্গামাটিতেই বসতি গড়ে তোলেন। পরে ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধে উদ্বাস্তু হয়ে খাগড়াছড়িতে বসতি গাড়েন তারা। তখন শতাধিক সাঁওতাল পরিবার সড়ক ও জনপদ বিভাগের শ্রমক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করলেও বিভিন্ন প্রাশাসনিক জটিলতায় কাপ্তাই বাঁধের ক্ষতিপূরণ থেকেও বঞ্চিত হন। তিনি ক্ষোভের সাথেই বলেন, নির্বাচনের সময়টাতেই জনপ্রতিনিধিদের দেখি। নির্বাচন শেষে আর কেউ আমাদের দিকে ফিরেও তাকান না।

পানছড়ির কানুনগো পাড়া সাঁওতালপল্লীর অসহায়দের জীবন চিত্র নিজ চোখে না দেখলেই নয়। আসলেই তারা আজ সমাজে অবহেলিত এক জনগোষ্ঠি। এই অবহেলিতদের ভাগ্য উন্নয়নে বে-সরকারী সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন পরিষদ থেকেও কিছু সহযোগিতা দরকার। তবেই তারা দিন দিন আরো উন্নতির শিখরে পা রাখতে সক্ষম হবে।।







এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।