সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

variants_large_7594.jpg

জেনে রাখুন কবর থেকে লাশ তুলে পুনরায় ময়না তদন্তের পদ্ধতি (শেষ পর্ব)

শরীরের ভিতরের বিভিন্ন নরম অঙ্গ যেমন লিভার, কিডনী ফুসফুস ইত্যাদি সংগ্রহ করে বিষাক্ত কোন পদার্থের অস্তিত্ব সনাক্ত করা হয়।

কবর থেকে লাশ তুলে পুনরায় ময়না তদন্তের বিষয়টি বহু আগে থেকেই চলে আসছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সহায়তায় মানুষের যেমন ময়না তদন্ত হয় তেমনি প্রাণি চিকিৎসক তথা ভেটেরিনারিয়ানদের দ্বারা হয় প্রাণির ময়না তদন্ত। 

যে সকল কারণে কবর থেকে লাশ তুলে ময়না তদন্ত করা হয় সেগুলো প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম পর্বে। পর্বটি পড়তে http://www.chomotkar.com/article/132 লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন। আজ দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে জানব ময়না তদন্তের পদ্ধতি সম্পর্কে।

যার নির্দেশে লাশ তোলা যায়: সাধারণত প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে অথবা করোনার (অপঘাতে মৃত্যু বা সন্দেহজনক মৃত্যুর কারণ তদন্তকারী বিচারক) পদ্ধতি চালু থাকলে করোনারের নির্দেশে লাশ তোলা যায়।

পদ্ধতি: কবর থেকে পুনরায় লাশ তুলে ময়না তদন্তের জন্য যা করা হয় সেগুলোকে নিম্নোক্তভাবে তুলে ধরা যায়:

সময়: পুনরায় ময়না তদন্তের জন্য লাশ তুলতে পর্যাপ্ত দিনের আলোর দরকার হয়। তাই সকাল সকালই সংশ্লিষ্ট টিমকে কবরস্থানে যেতে হয়।

উপস্থিতি: লাশ উত্তোলনের সময় ম্যাজিস্ট্রেট অথবা করোনার, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ডাক্তার, সিআইডি ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন।

কবর সনাক্তকরণ: আত্মীয়-স্বজন অথবা অফিসার ইনচার্জ কর্তৃক কবর যথাযথভাবে সনাক্ত করতে হবে।

পর্দা টানানো ও খনন কাজ: অতি উৎসুক জনতার উপস্থিতি থাকলে পর্দা টানিয়ে পেশাদার কবর খননকারী দ্বারা কবর খনন কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

মাটি সংগ্রহ: লাশের চারপাশের মাটি সংগ্রহ করে আলাদা আলাদা কাঁচের পাত্রে রাখা হয়। এই মাটি আর্সেনিক বা অন্য কোন বিষ প্রয়োগে হত্যার তথ্য উৎঘাটনে সহায়ক।

অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা: কফিন হলে খোলা মাত্রই ডাক্তার দ্রুত লাশের শরীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। প্রয়োজনীয় ছবি তুলে রাখবেন। দূর্গন্ধ যাতে বাতাসে ছড়াতে না পারে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। কাফনে জড়ানো কাফন বিহীন লাশেও এ রকম করা হবে।

ময়না তদন্ত বা পোস্ট মর্টেম: উপর্যুক্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যই ছিল এই ধাপটি সম্পন্ন করা।এই ধাপটি সম্পন্ন করতে লাশ মর্গে নেয়া হয়। অতঃপর:

  • যদি লাশের শরীরে কোন কীট-পতঙ্গ থাকলে সেগুলোকে পানি ছিটা দিয়ে পরিষ্কার করা হবে না। কারণ পরিষ্কার করলে বিষের নমুনা থাকলে তা সনাক্তকরণে ভুল হতে পারে।
  • যদি গন্ধ খুব বেশি অসহ্য হয় তবে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণে ডুবানো গজ মাস্ক মুখমণ্ডলে পড়ে নেয়া হয়।
  • শরীরের ভিতরের বিভিন্ন নরম অঙ্গ যেমন লিভার, কিডনী ফুসফুস ইত্যাদি সংগ্রহ করে বিষাক্ত কোন পদার্থের অস্তিত্ব সনাক্ত করা হয়। ধাতব বিষ অনেক বছর ধরে শরীরে থেকে যায়। চুল, নখ, হাড় যেমন ফিমার বা ঊর্বস্থিতেও ধাতব বিষ আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

শুধু হাড় পেলে করণীয় পদ্ধতি: যদি শুধুমাত্র হাড় পাওয়া যায় (পুরনো লাশ) তবে সেগুলোই পরীক্ষার জন্য নেয়া হয়। হাড়গুলো পরীক্ষার পূর্বে সিদ্ধ করা হয়। প্রয়োজনে গুড়া করাও হয়।

একজন কবি ও যোদ্ধা আলরিচ ভন হাটেন (Ullrich von Hutten: 1488-1523) এর মৃত্যুর সময় ধারণা করা হয়েছিল যে  সিফিলিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু বিশ শতকে ঐতিহাসিক কারণে তার লাশ পুনরায় তুলে ময়না তদন্ত করেছিলেন প্যাথোলজিস্ট ই. ইউহ্লিনজার। 

তিনি হাড়গুলো সিদ্ধ করে চূর্ণ করেছিলেন। অতঃপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান যে, হাটেন সিফিলিসে নয় বরং পলিওস্টোটিক স্কেলেরোসিস অস্টিওমায়েলাইটিস আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

প্রাণির পুনরায় ময়না তদন্ত: প্রাণির ক্ষেত্রেও একই কারণ যেমন রোগ নির্ণয়, হত্যার কারণ অনুসন্ধান ইত্যাদির জন্য ময়না তদন্ত করা হয়। তবে মানুষের হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে প্রাণির মৃতদেহ তোলার ঘটনা খুবই বিরল। ১৯৩৪ সালের ২২ মে, আর্থার মেজর কিছু মাংস খেয়েছিলেন। 

যাতে ইথেল লিলি মেজর কোন কারণে স্ট্রিকনিন বিষ মেশান। আর্থার মাংসে ভিন্ন স্বাদ অনুভব করলে তা ছুড়ে ফেলে দেন। প্রতিবেশীর একটি কুকুর মাংসগুলো খেয়ে ২৩ মে পেশী সংকোচনের পর মারা যায়। আর্থারও ঠিক একইভাবে ২৪ মে মারা যান। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল মৃগীরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

২৬ মে একটি বেনামী চিঠি যায় পুলিশ অফিসারের কাছে। তখন তারা তদন্তে নামেন। ডা. রোচ লিঞ্চ মৃত কুকুরটিকে মাটির নিচ থেকে তুলে প্রাণিবিদদের কাছে ময়না তদন্তের তথ্য চান। কুকুরটির শরীরে স্ট্রিকনিন বিষ পাওয়া যায়। পরে তিনি আর্থারের শরীরেও একই বিষের উপস্থিতি পান। 

পরবর্তীতে প্রধান তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সাক্ষাৎকারের সময় কথার ভুলে সত্য কথা প্রকাশ করেছিলেন ইথেল। এ অপরাধে ১৯ ডিসেম্বর ১৯৩৪ সালে ইথেলকে ফাঁসি দেয়া হয়। মানুষের মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে প্রাণির লাশ পুনরায় তুলে ময়না তদন্তের বিরল ঘটনাটি ইংল্যান্ডের লিংকনশায়ারে ঘটেছিল।

ময়না তদন্তের অনেক ভিডিও পাওয়া যায় ইন্টারনেটে। তবে সবশ্রেণীর পাঠকের জন্য উপযোগী না হওয়াও এই লেখাটিতে ভিডিও লিঙ্ক দেয়া হল না। নিয়মটি শুধুমাত্র কিছুটা জ্ঞানার্জনের জন্য প্রদত্ত হল। সবক্ষেত্রেই এই নিয়মটির হুবহু মিল নাও থাকতে পারে। প্রচলিত আইন-কানুনের জন্য ক্ষতিকর, তদন্তে ব্যাঘাত ঘটানো, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ইত্যাদিতে এই লেখার ব্যবহার ভিত্তিহীন।

সূত্র: Murderpedia, Fenton JJ Toxicology, Lane, B. The encyclopedia of Forensic Science.

ছবিটি রূপক। 


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।