সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

1506148_10151959629241989_468927732_o.jpg

বুক রিভিউ প্রভাষ আমিনের 'প্রধানমন্ত্রীই যখন অসহায়' সত্যিকার সময়ের দলিল

প্রধানমন্ত্রীই যেখানে অসহায়’ এর সবগুলো কলাম জুড়ে প্রভাষ আমিনের জাদুকরি বিশ্লেষণী শক্তি আমাদের সমসাময়িক নানা বিষয়ের অনেক গভীরে নিয়ে যায় অনায়াসেই। আমরা মগ্ন হই,সমাজের নতুন এক ছবি ভেসে ওঠে চোখে। ‘ প্রধানমন্ত্রী যেখানে অসহায়’ তাই কেবল একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণই নয়,ববং এক স্বপ্নের বয়ান।

দেশের গণমাধ্যম, সাংবাদিকতার নানা অনুষঙ্গ , রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখা প্রভাষ আমিনের 'প্রধানমন্ত্রীই যেখানে অসহায়' পড়ে আপাত দৃষ্টিতে সাধারন এক নাগরিকের ক্ষোভ আর হতাশার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হলেও অসাধারন বিশ্লেষণী শক্তির জন্য উপস্থাপিত বিষয়গুলো সময়ের প্রতিচিত্র হয়ে উঠেছে।
এ কলাম গ্রন্থ পড়ে একজন পাঠক অনায়াসেই ঘুরে আসতে পারেন এই দশকের উল্লেখযোগ্য সব ঘটনা প্রবাহ থেকে। এ ভ্রমণে প্রভাষ আমিন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান সঙ্গী হবেন তার।

প্রভাষ আমিনের ক্ষোভের জায়গাটা মুলত ঘুণে ধরা সমাজ আর কখনও কখনও তার প্রিয় মানুষগুলোর বিরুদ্ধে। যে সমাজ আর মানুষগুলোকে তিনি অনেক ভালবাসেন। তবে যথেষ্ট পরিমিতি বোধ থাকায় তার এ ক্ষোভ কখনও দ্রোহে পরিণত হয়নি।
আপাদমস্তক সংবাদকর্মী প্রভাষ আমিনের ভালবাসার বেশ খানিকটা অংশ জুড়ে রয়েছে ‘সাংবাদিকতা’। ভাললাগার এ পেশাটি নিয়ে তাই তার চিন্তার পরিধি ব্যাপক। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম ও এই পেশায় জড়িয়ে থাকা মানুষজন তার বড় আপনজন।
তাই এই কাছের মানুষদের বিচ্যুতি ও মতিভ্রম তাকে চিন্তায় ফেলে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ও প্রগতিশীলদের প্রধান আশ্রয়স্থল দৈনিক প্রথম আলোর অসাবধানতা ও স্থলন তাকে কেবল বিব্রতই করেনি বরং কলম ধরতে বাধ্য করেছে। প্রথম আলোর একজন প্রাক্তন কর্মী হিসেবে প্রথম আলোর পাশে দাড়িয়ে ভুল ধরিয়ে দেয়া তার দায়িত্ব সচেতনতার পরিচয়ই দেয়।  
তবে এ ক্ষেত্রে তিনি আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারতেন ,কিংবা নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে পারতেন যদি তিনি নাম ধরে ধরে কেবল প্রথম আলো নয় বরং বাংলাদেশের আরও কিছু সংবাদ মাধ্যমকেও শুধরে দিতে পারতেন কিংবা শুধরে দেয়ার চেষ্টা করতেন।
প্রথম আলোর মতো শক্তিশালী ও সুশীল গোষ্ঠীর গণজাগরণ মঞ্চ বিষয়ক নোংরামি কিংবা জামায়াতের রক্ষা কবচ হয়ে ওঠার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো তুলে এনে কলামিস্ট যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় তার ‘ আওয়ামী লীগের কান নিয়েছে চিলে’ কিংবা ‘ভৌতিক বিলবোর্ড ‘ শীর্ষক কলামগুলোতে।
এবিএম মূসার মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে মানসিক ভারসাম্যহীন কিংবা বঙ্গবন্ধুবিদ্বেষী তকমা দেয়ায় শাসক দলের কড়া সমালোচনা করতে ছাড়েননি প্রভাষ আমিন। এমনকি এবিএম মূসার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শক্ত অবস্থানের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
কোন রকম আইন কানুন ও নিয়মনীতি না মেনে সরকারী অর্থায়নে রাজধানী জুড়ে বিলবোর্ডের মাধ্যমে মহাজোটের সাফল্য প্রচারনার মতো বিষয়গুলোর তীব্র সমালোচনা উঠে এসেছে তার বইয়ে।
পেশাগত কারনে অথবা তার ভাষ্যমতে পেটের দায় মেটাতেই জাতীয় ও রাজনৈতিক অনেক ইস্যুরেই দর্শক হতে হয়েছে তাকে।কিন্তু অনুসন্ধানিচ্ছু প্রভাষ আমিন কেবল একজন দর্শক বা সংবাদকর্মীর গণ্ডির মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখেন নি। তার প্রমাণ “ঝলসানো গণতন্ত্র’’ “,জেগে ঘুমালে কাউকে জাগানো যায় না” ,‘‘ সম্পাদক পরিষদ : প্রত্যাশার বাতিঘর’’ শীর্ষক লেখাগুলোতে।
খানিকটা প্রতিবাদী ঢঙে লেখা এসব কলামে তার বিশ্লেষনী ও অনুসন্ধানী মনোভাব পাঠককে জাগিয়ে তোলে, অনুরণিত ও আন্দোলিত করে।একজন মনযোগী পাঠক তাই হঠাৎ করেই জেগে উঠতে পারেন। দীর্ঘ দিনের ঘুম শেষে জীর্ণতা ঘুচিয়ে যে কেউ স্বপ্ন দেখতে পারেন। বিবেককে জাগ্রত করবার মতো ক্ষমতা সবার থাকে না।
প্রভাষ আমিনেরও পুরোটা নেই। তবে যতটুকু আছে সেটাই বা কম কিসে? বর্তমান টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতার বিষয়টি উঠে এসেছে তার ‘সবার আগে সংবাদ, নাকি সবার আগে সঠিক সংবাদ?’ শীর্ষক লেখায়।প্রসঙ্গত তিনি আতাউস সামাদের মতো বিশিষ্ট সাংবাদিকের মৃত্যুর আগেই মৃত্যু সংবাদ প্রচারের বিষয়টি তুলে ধরেন।
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকতে গিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ফাঁদে পা দেয়া কিংবা লাল রঙ্গে ব্রেকিং নিউজ পরিবেশনের মতো গণমাধ্যমের অসংখ্য অসংগতি উঠে এসেছে তার লেখায়। ‘প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেখানে অসহায়’ শীর্ষক লেখায় সাংবাদিকদের অসাংবাদিক সুলভ আচরণের সমালোচনা তার বস্তু নিষ্ঠতার পরিচয় দেয়।
সাংবাদিকদের গাড়ি যখন ব্যক্তিগত কাজেও রাস্তায় বাড়তি সুবিধা দাবি করে তখন একজন সংবাদ কর্মী হিসেবে তিনি লজ্জা পান।অপরদিকে , বিপদাপন্ন মানুষজন যখন বিপদে পরলে পুলিশের কাছে না গিয়ে সাংবাদিকদের কাছে ছুটে আসে তখন তার প্রিয় পেশাটিকে নিয়ে গর্বের শেষ থাকে না।
বইয়ে উল্লেখিত আরেকটি স্পর্শকাতর অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল দাওয়াতি সাংবাদিকতা। যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে বলে আগে থেকেই সংবাদ পেলে সংবাদকর্মীরা সংবাদ সংগ্রহে যাবেন নাকি ক্ষয় ক্ষতি কমানোর লক্ষে পুলিশে খবর দেবেন এমন একটি অমীমাংসিত বিষয় তুলে ধরে লেখক অনেক পাঠককেই বেশ খানিকটা চিন্তায় ফেলে দিয়েছেন।
এ ধরনের ‘কল এ যাওয়া’ সাংবাদিকতার এথিক্স কতটা অনুমোদন করে, লেখকের এই প্রশ্ন সাংবাদিকতার দায়িত্বের পরিধি নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ জাগায়। 
গোটা বই জুড়েই লেখকের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর মধ্যে অন্যতম মনে হয়েছে, লেখক তার প্রিয় পেশা সাংবাদিকতাকে একটা মানবিক পেশা হিসেবে দাড় করাতে পেরেছেন। যোগাযোগ ত্বাত্তিকদের মতো তিনি সাংবাদিকদের দায়িত্ব কেবল সংবাদ সংগ্রহের মধ্যেই আটকে রাখেন নি।
বরং সমাজের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল মহল সাংবাদিকদের মানবিক আবেদন সম্পন্ন হবার ব্যাপারটি নিয়ে তার সোচ্চার হওয়া অনুরণিত করে।
লেখকের আশাবাদ তাই এভাবেই ঊঠে এসেছে ... ‘‘সময় এসেছে গণমাধ্যমের কিছু জরুরি প্রশ্ন মীমাংসা করার। সোর্স আর সন্ত্রাসীদের মধ্যে পার্থক্য টানার। ব্রেকিং নিউজ আর উসকানির মধ্যে পার্থক্য টানার’’। (ক্যামেরা আন্দোলনের দাওয়াতি সাংবাদিকতা ,পৃষ্ঠা ৩৭ )
সত্যিতো! এমন সব সংবেদনশীল বিষয়গুলো তো এখনও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। গণমাধ্যম কীণবা সুশীল সমাজের অন্য কেউ-ই যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছেন না, তখন নিজেকে একজন সামান্য (!) মানুষ বলে দাবি করা প্রভাষ আমিন আমাদের চোখ খুলে দিলেন কিনা সে প্রশ্ন আসতেই পারে।
সাংবাদিক থেকে শুরু করে অন্যান্য পেশাজীবীদের রাজনৈতিক পরিচয়কেই বড় করে দেখা বিষয়ে তার অসন্তুষ্টি লক্ষ করা যায়। রাজনীতি যখন মূল পেশাকে ছাড়িয়ে যাবে তখন আর আগের পরিচয় দেয়া উচিৎ নয় বলে তিনি মনে করেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে লেখকের বক্তব্য চোখে পড়ার মতো। এ বিষয়ে তিনি যথেষ্ট সোচ্চার হলেও স্বাধীনতা মানে যে স্বেচ্ছাচারিতা নয় সেটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। তবে এ প্রসঙ্গে প্রভাষ আমিন মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা জায়েজ মনে করলেও আমার দেশ বন্ধ হওয়াকে কেন সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করা ভাবেন ,সে বিষয়ে স্পষ্ট নন।
প্রভাষ আমিনের লেখার একটা বড় বৈশিষ্ট তার সরস বাক্যালাপ। বিদ্রুপময় অথচ যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক করে বিষয়কে তুলে ধরার অসাধারন এক ক্ষমতা পাঠকের দৃষ্টি এড়াবে না কিছুতেই। যেমন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে লেখক তুলে ধরেছেন অনেকটা এভাবে, ‘মাহমুদুর রহমান মেলামিনের ভালো বাসন- কোসন বানাতে পারেন ,ভালো ষড়যন্ত্র করতে পারেন।তবে সাংবাদিকতাটা পারেন না’।
প্রভাষ আমিনের অধিকাংশ কলামই সরল গদ্যে লেখা। বিষয়ের গভীরতার পাশাপাশি ভাষার উপর তার দক্ষতা স্পষ্ট। তাই কোথাও হোঁচট খেতে হয় না,বরং অনায়াসেই পড়ে ফেলা যায়।

তবে তার লেখায় মানবিক আবেদন, ও সংবেদনশীলতা বাকি গুনকে ছাপিয়ে গেছে। রানা প্লাজা ধসে নিহত এক পায়ে নূপুর ওয়ালা অপরিচিতা বনের জন্যে কিংবা নিরীহ খেটে খাওয়া দর্জি বিশ্বজিতের জন্যে তার নিবির মমত্ববোধ আমাদের মানবিক আবেদনকে অনায়াসেই জাগ্রত করতে পারে।
‘ প্রধানমন্ত্রীই যেখানে অসহায়’ এর সবগুলো কলাম জুড়ে প্রভাষ আমিনের জাদুকরি বিশ্লেষণী শক্তি আমাদের সমসাময়িক নানা বিষয়ের অনেক গভীরে নিয়ে যায় অনায়াসেই। আমরা মগ্ন হই,সমাজের নতুন এক ছবি ভেসে ওঠে চোখে। ‘ প্রধানমন্ত্রী যেখানে অসহায়’ তাই কেবল একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণই নয়,ববং এক স্বপ্নের বয়ান।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।