সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

mango-the-fruit.jpg

ফল পুষ্টিগুণে ভরপুর সুস্বাদু আমের যতকথা

আম উচ্চ প্রোটিন, ভিটামিন এ, সি, বি৬, কে, ফোলিক এসিড, আঁশ ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ একটি ফল। এছাড়া আমে কপার, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট যেমন বিটা ক্যারোটিন ও জিয়াজেন্থিন রয়েছে।

আমের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা, সংস্কৃতে আম্র, বাংলায় আম, মালয় ও জাভা ভাষায় ম্যাঙ্গা, তামিল ভাষায় ম্যাংকে এবং চীনা ভাষায় ম্যাংকাও। পর্তুগিজরা ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপনের সময় এ ফলের নাম রাখে ম্যাঙ্গা। আম অর্থ সাধারণ। সাধারনের ফল আম। একে মধু ফলও বলা হয়ে থাকে। আম আমাদের বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ এবং ভারত, পাকিস্তান এবং ফিলিপাইনের জাতীয় ফল।

ধারনা করা হয়ে থাকে যে আম প্রায় সাড়ে ৬০০ বছরের পুরনো একটি ফল। জন্মস্থান নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক থাকলেও ভারতের কোন এক অঞ্চলেই এই আমের আদিবাস। ইতিহাস থেকে জানা যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ এ আলেকজেন্ডার সিন্ধু উপত্যকার আম খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এ সময়ই আম ছড়িয়ে পড়ে মালয় উপদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ ও মাদাগাস্কারে।   

আম সম্পর্কে কিছু ধারনা:
আম গাছ সাধারণত ৩৫-৪০ মিটার লম্বা হয়ে থাকে এবং এই গাছ অনেকদিন বাঁচে। কিছু জাতের আম গাছ এমনও দেখা যায় প্রায় ৩০০ বছরও বাঁচে।এই গাছের শেকড় মাটির নিচে বহুদুর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে।

বিভিন্ন ধরনের আম আমাদের দেশে পাওয়া যায় যেমন, ল্যাংড়া, খিরসাপাতি, গোপালভোগ, চিনিকলম, মহনভোগ, কাঁচা মিষ্টি, ফজলি ইত্যাদি।

একে ফলের রাজাও বলা হয়ে থাকে। স্বাদের দিক থেকে এটি শুধুমাত্র সুস্বাদু ও তরতাজাই নয় এই ফলের অনেক ভালো গুন রয়েছে।

আমের পুষ্টিগুণ:
আম উচ্চ প্রোটিন, ভিটামিন এ, সি, বি৬, কে, ফোলিক এসিড, আঁশ ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ একটি ফল। এছাড়া আমে কপার, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট যেমন বিটা ক্যারোটিন ও জিয়াজেন্থিন রয়েছে।

আমের স্বাস্থ্য উপকারিতা:
আম খাওয়ার ফলে আমাদের জীবনযাপনের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি কমে যায়। এখানে আমের কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা তুলে ধরছি:

  • ক্যান্সার প্রতিরোধে: গবেষকরা বলেছেন যে, আমে এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকার ফলে এটা কোলন, স্তন, লিউকেমিয়া এবং প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে।
  • কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়: আমে থাকা উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি, পেকটিন ও আঁশ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়।দেহ তরল এবং কোষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যৌগ পটাশিয়ামের খুব ভালো উৎস হচ্ছে তাজা আম যা উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  • ওজন কমাতে: আমে অনেক ভিটামিন ও পুষ্টি উপাদান রয়েছে।আঁশ জাতীয় খাবার হজমক্রিয়াতে সাহায্য করার ফলে তা দেহের বাড়তি ক্যালরি ক্ষয় করতে সাহায্য করে। এছাড়া আম খেলে ক্ষুধা কমে এবং কোলেস্টেরল ও গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
  • হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায়: আমে উচ্চ আঁশ ও এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় তা হৃদরোগের সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমায়।এক কাপ আমে ৩ গ্রাম আঁশ রয়েছে।গবেষণায় দেখা যায় যে প্রতি ৭ গ্রাম আঁশ গ্রহনের ফলে হৃদরোগের সম্ভাবনা কমায় ৯%।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে: শুধু আম নয় আমের পাতাও বেশ উপকারী।যাদের ডায়াবেটিস আছে তারা যদি ৫-৬টি আম পাতা ধুয়ে একটি পাত্রে সেদ্ধ করে নিয়ে সারারাত রেখে সকালে এর ক্বাথ ছেকে নিয়ে পান করে করেন তাহলে এটা ইন্সুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করেন।এছাড়া আমের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (৪১-৬০)কম বলে এটা যদি মাঝে মাঝে বেশি খাওয়া হয়ে যায় তবে সুগারের মাত্রা খুব বেশি বাড়বে না। তবে নিয়মিত ভাবে না খাওয়াই ভালো। 
  • রক্তশূন্যতা নিয়ন্ত্রণে: আমের উচ্চমাত্রার আয়রন রক্তশূন্যতা দূর করার খুব ভালো একটি উপায়।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে: উচ্চ আঁশযুক্ত আম স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।এটা ভালো হজমের জন্য এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধের জন্য খুবই কার্যকরী।
  • অ্যাজমা প্রতিরোধে: যারা আম খেয়ে থাকেন তাদের মাঝে অ্যাজমা হওয়ার সম্ভাবনা কম।এটি আমের একটি চমকপ্রদ স্বাস্থ্য উপকারিতা।এতে থাকা উচ্চ বিটা ক্যারোটিন অ্যাজমা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
  • চোখের যত্নে: আমে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন এ। শুধু মাত্র এক কাপ পাকা আম খেয়ে সারাদিনের ভিটামিন এ র চাহিদার ২৫% পুরন করা সম্ভব। এছাড়া এটা দৃষ্টিশক্তিকে উন্নত করতে সাহায্য করে,চোখের শুষ্কতা ও রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে।
  • জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে: গর্ভাবস্থায় আম খাওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে। আম বি ভিটামিনে সমৃদ্ধ। এতে ভিটামিন বি১,বি২,বি৫,বি৬,নায়াসিন এবং ফলিক এসিড রয়েছে। ফলিক এসিড গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারন এটা জন্মগত ত্রুটির সম্ভাবনা কমায়।দৈনিকফলিক এসিডের চাহিদা হচ্ছে ৪০০ মাইক্রোগ্রাম আর এক কাপ তাজা আম থেকেই পাওয়া যায় ৭১ মাইক্রোগ্রাম। পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও কালসিয়ামসহ খনিজ পদার্থের বেশ ভালো উৎস হচ্ছে আম।
  • হজমে সাহায্য করে: আম প্রচুর খাদ্য আঁশ,ভিটামিন ও খনিজে ভরপুর।এতে থাকা এনজাইম প্রোটিনকে ভাঙ্গতে সাহায্য করে।আমে থাকা আঁশ হজমে এবং বর্জ্য ত্যাগ করতে সাহায্য করে।
  • হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে: গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খড়রৌদ্রে একটি আমের রসের সাথে সামান্য পানি,এক টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে খেলে তাৎক্ষণিকভাবে শরীর ঠাণ্ডা হয় এবং হিট স্ট্রোক প্রতিরোধ হয়। 
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে: আমে ভিটামিন সি, এ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রায় ২৫টি ক্যারোটিনয়েডের মাত্রাতিরিক্ত ভালো সমন্বয়ের ফলে এটা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে খুবই কার্যকর।
  • মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে: এই ফলে রয়েছে উচ্চ মাত্রার গ্লুটামাইন এসিড নামক এটি প্রোটিন যা মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।পড়ালেখায় অমনোযোগী বাচ্চাদের আম খেতে দেয়া উচিত।
  • কিডনীর পাথর কমাতে: চীনা ঔষধ শাস্ত্রে,কিডনীতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমানোর জন্য আমের টক, মিষ্টি ও শীতলীকরণ শক্তিকে বিবেচনা করা হয়।
  • পেটের টনিক হিসেবে: শুধু আম নয় উপকারিতা প্রয়েছে আম পাতারও। রাতে ঘুমানোর আগে গরম পানিতে ১০/১৫টি পাতা দিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখে সকালে সেই পানিটা ছেকে খালি পেটে নিয়মিত খেলে পেটের জন্য তা খুবই ভালো।

-
লেখক: জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ, এক্স ডায়েটিশিয়ান, পারসোনা হেল্‌থ, খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান (স্নাতকোত্তর) (এমপিএইচ), নিউট্রিশন এবং ডায়েট থেরাপিতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।