সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

524b13ffb0ecd-ad-11.jpg

বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক

একটি বীজ থেকে ছোট্ট দুই পাতার একটি চারা গাছের জন্ম হয়। তারপর শুরু হয় তার বেড়ে ওঠা, বিস্তৃতি। তেমনি সংসার নামের একটি গাছও তৈরি হয় দু’জনের মাধ্যমে; তারপর এর বিস্তৃতি। সংসার ছোট্ট একটি শব্দ, কিন্তু এর বিস্তৃতি ব্যাপক ও বিশাল। সংসার শব্দটির আভিধানিক অর্থ জগত্, পৃথিবী, গার্হস্থ্য জীবন্ত পরিবার, ঘরকন্না, মায়াবন্ধন, পার্থিব আকর্ষণ। তথ্য সূত্র : সংসদ বাঙ্গালা অভিধান। এ সংসারের শুরু হয় দু’জন নর ও নারীর বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে। এরপর একে একে বাড়তে থাকে সংসারের সদস্য সংখ্যা।
আর এ সংসারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের মধ্যে অন্যতম শাশুড়ি ও ছেলের বউ। শ্বশুর ও ছেলে সবসময় কাজের তাগিদে বাইরে থাকে। তাই ছেলের বউ আর শাশুড়ির উপস্থিতিই সংসারে বেশি সময়। অবশ্য এখন অনেক ছেলের বউও চাকরি করার জন্য বাইরে বের হচ্ছে। তবুও এই বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে বাধে নানা ঝামেলা। তবে সব সময় ঝামেলা শুধু বাড়ে তা নয়; দু’জনের মধ্যে বেশ সখ্যতাও লক্ষ করা যায়।
এই তো সেদিন বিয়ে হলো মনিকা ও নিউটনের। নতুন সংসার, নতুন সব মানুষ। কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছেন এই নতুন সংসারে—এমন প্রশ্ন করতেই মনিকা বলেন, নতুন জায়গায় একটু সমস্যা তো হয়ই। তবে আমাদের যেহেতু সেটেলড ম্যারেজ, সেই দিক থেকে দেখতে গেলে আমাকে সবাই দেখেশুনেই ঘরে তুলেছে। আমার শাশুড়ি আমাকে খুব পছন্দ করেন। এখন দেখি আমি তাকে কতটা আপন করে নিতে পারি। পাশে থেকে ফোড়ন কাটলেন শাশুড়ি। বললেন, ইচ্ছা থাকলেই আপন করা যায়। বিয়ের আগের আচার-ব্যবহারের সঙ্গে বিয়ের পরের আচার-ব্যবহারের কোনো মিলই থাকে না। বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই ছেলের বউরা নিজেকে বাড়ির কর্ত্রী মনে করা শুরু করে। তারা ভাবে না, শাশুড়িরা কত কষ্ট করে তিল তিল করে একটি সংসার দাঁড় করিয়েছে। আর তাছাড়া আজ কিংবা কাল এ সংসারটা তারই হবে। এ নিয়ে এত ব্যস্ত হওয়ার কী আছে। পাশে চুপ করে বসে থাকা মনিকা বলেন, সংসারের দায়িত্ব নিলেও সমস্যা, আবার না নিলেও সমস্যা। দায়িত্ব নিলে বলবে, সংসারে মাতব্বরি করে, আর না নিলে বলবে একেবারে গা ছাড়া ভাবে চলে, কোনো দায়দায়িত্ব নেই। আসলে উনাদের মনের ভাব বোঝাটাই মুশকিল।
দু’জন পছন্দ করে বিয়ে করেছে জেসমিন ও তরিকুল। এ নিয়ে সংসারে বিশাল হুলস্থূল। একসময় সবকিছু ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু সুযোগ পেলেই দু’কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়েন না জেসমিনের শাশুড়ি। অথচ জেসমিন বলেন, তিনি তার সাধ্যমত শাশুড়ির সঙ্গে মানিয়ে চলতে চেষ্টা করেন। এমনকি রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সংসারের সব কাজ তিনি নিজে করেন। তাহলে জেসমিনের অন্যায়টা কোথায়! জেসমিনের অন্যায় বলতে তার শাশুড়ি মনে করেন, ছেলের বউ তার ছেলেকে বশ করে হাতিয়ে নিয়েছে। আর জেসমিনের বাবার বাড়ি থেকে তার ব্যবহার্য কোনো জিনিসপত্র দেয়া হয়নি। এটাই হলো জেসমিনের সবচেয়ে বড় অন্যায়। এজন্য হরহামেশা তাকে শ্বশুরবাড়িতে অপদস্থ হতে হয়।
এই যে বউ-শাশুড়ির সম্পর্কের টানাপড়েন। এর জন্য বউ আর শাশুড়ি দু’জনই সমানভাবে দায়ী। তাই সম্পর্কের উন্নতির জন্য দুজনকেই কিছু কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে হবে। যেমন—
শাশুড়ির ক্ষেত্রে : শাশুড়িকে মাথায় রাখতে হবে, ছেলের বউ তার সংসারে নতুন সদস্য। তাই তাকে এ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে কিছুদিন সময় দিতে হবে এবং পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে তাকে সাহায্য করতে হবে। তাকে আপন করে নিলে দেখবেন সে-ও আপনাকে আপন করে নেবে। আর তার বাবার বাড়ি সম্বন্ধে তাকে কখনও নেতিবাচক কোনো কথা বলবেন না। কোনো জিনিস নিয়ে খোঁটা দেবেন না। আর ছেলের বউ যদি চাকরিজীবী হয়, তাহলে তাকে চাকরি করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করবেন। নতুন বউ কোনো কিছু রান্না করলে মুখের ওপর খারাপ হয়েছে বলবেন না। যদি খুব খারাপও হয়, তবু তার রান্নার প্রশংসা করুন। একটু ভুলভাল হলে আপনি তাকে শিখিয়ে দিন। আপনার পরিবারের কাজের সঙ্গে তার পরিবারের কাজের মিল থাকতে না-ও পারে। তাই তাকে আপনার পরিবার সম্বন্ধে ধারণা দিয়ে নিন।
ছেলের বউয়ের করণীয় : আপনি মাথায় রাখবেন, আপনি এই পরিবারে একেবারে নতুন। তাই নতুন পরিবার সম্বন্ধে জানতে সময় নিন। ভুলেও আগ বাড়িয়ে কোনো কথা বলবেন না বা কাজ করতে যাবেন না। শাশুড়িকে যতটা সম্ভব আপন করে নিতে চেষ্টা করবেন। আর যে কোনো কাজ তাকে জিজ্ঞেস করে তারপর করবেন। সবচেয়ে সহজ বুদ্ধি হলো, তাকে মধুর স্বরে মা বা আম্মা বলে ডাকবেন। ডাকের মধ্যে মিষ্টতা থাকলে দেখবেন উনিও আপনাকে আপন করে নেবে। আপনি যদি চাকরিজীবী হন, তাহলে চাকরির বড়াই করবেন না। চাকরি করতে যাওয়ার আগে যতটা সম্ভব হবে সংসারের কাজ গুছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। আর যেটুকু পারবেন না শাশুড়িকে বুঝিয়ে বলে যাবেন। আবার চাকরি শেষে বাসায় এসে শুয়ে বসে সময় না কাটিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে সংসারের কাজে হাত লাগাবেন। আর এখন যেহেতু মোবাইলের যুগ, তাই চাকরি ক্ষেত্রে গিয়ে শাশুড়িকে মোবাইল করে দুপুরে খাওয়ার কথা বা গোসল করার কথা, ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিন। দেখবেন এতে উনি বেশ খুশি হবেন। বাসায় ফিরে তাকে যতটা পারেন সময় দিন, একসঙ্গে চা খেতে খেতে সারাদিনে অফিসে বা বাইরে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে তার সঙ্গে গল্প করুন। তাকে বন্ধু ভাবুন, দেখবেন তাহলে আপনার আর এই নতুন পরিবারে আগন্তুক বা একাকী মনে হবে না। শাশুড়ি গুরুজন, তাই কখনও কোনো কথা বললে সেটার প্রতি-উত্তর না করে মুখ বুজে সহ্য করুন। ভাবুন না, আপনার মাও তো আপনাকে ছোটবেলায় কারণে-অকারণে নানা কথা শুনিয়েছেন। অনেক ছেলের বউ নিজের স্বামীর আয় রোজগার নিয়ে শাশুড়ির সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করে। শ্বশুর শাশুড়িকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু এটা অন্যায় মহা অন্যায়। একবার ভাবুনতো আপনার স্বামীকে জন্ম দেয়ার পর থেকে শুরু করে এই চাকরিজীবী হওয়া পর্যন্ত কে বা কারা নিজেদের শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেছে। তাই অহেতুক ছোট মনের পরিচয় দেবেন না।
যে কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার প্রধান ও অন্যতম শর্ত হচ্ছে ছাড় দেয়া। তাই কোনো বিষয়ে জেদ না করে সবার সঙ্গে মানিয়ে চললেই একটা সম্পর্ক স্থায়িত্ব লাভ করে। আর একা একা কোনো মানুষ সুখী হতে পারে না। পরিবারের সবাই একসঙ্গে থাকার মজাই আলাদা। তাই ছেলের বউ বা শাশুড়ি দু’জনেরই উচিত একটি পরিবারকে টিকিয়ে রাখা। ছেলেমেয়ে নিয়ে অনেক সময় শাশুড়ির সঙ্গে বউদের ঝামেলা বাধে—এটা আমলে নেবেন না। নাতি-নাতনির প্রতি একটা আলাদা টান দাদা কিংবা দাদির থেকেই থাকে। তাই ছেলেমেয়ে শাসন করার সময় বাধা দিলে এ নিয়ে হুলুস্থূল করার দরকার নেই। ঠাণ্ডা মাথায় পরে বুঝিয়ে বলুন যে, ছেলেমেয়েদের শাসন না করলে তারা ভালো মানুষ হতে পারবে না। তাই সবাই যদি শুধু আদরই করি, শাসন তো কাউকে না কাউকে করতেই হবে। এ ব্যাপারটি শাশুড়িকে বুঝিয়ে বললেই দেখবেন, তিনি বেশ বুঝে যাবেন।
তাই আর দেরি না করে সংসারে জটিলতা দূর করতে বউ কিংবা শাশুড়ি দু’জনই পারেন উপরের টিপসগুলো অনুসরণ করতে। তখন দেখবেন আপনার সংসারে সুখপাখিটা ধরা দেবে আর সুখময় গানে ভরে তুলবে আপনার সংসার।
সত্যিকথা বলতে কি সবারই মাথায় রাখা উচিত্ একদিন সেও বুড়ো হবে, শাশুড়ি হবে। চালিত হতে হবে অন্যের দ্বারা। তখনকার কথা ভেবে যদি মনে করে আমার ছেলের বউ আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে কতটা খারাপ লাগবে। তাই নিজের স্থান থেকে বিচার করে শাশুড়ির সঙ্গে মানিয়ে চলুন। আর শাশুড়িদের ও উচিত্ ছেলের বাউদের একটু ছাড় দেয়া। সময় পাল্টেছে, পাল্টেছে রীতিনীতি ও তাই আপনাদের আমলে আপনাদের শাশুড়ি যে ব্যবহার করেছে তার প্রতিশোধ নিবেন, এটা তো কোনো কথা হলো না। বরং আপনি দেখিয়ে দিন, আপনার শাশুড়ি খারাপ হলেও আপনি একজন ভালো শাশুড়ি। তাই বউ শাশুড়ির সম্পর্ক অম্ল না হয়ে মধুর হয়ে উঠুক এই প্রত্যাশা সব বউ শাশুড়ির প্রতি।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।