সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

Bangladesh-National-Museum.jpg

ঘুরে আসুন শেকড়ের সন্ধানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে

বাংলাদেশের গৌরবময় সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে জাদুঘরটিতে যেতে পারেন। ব্যস্ত জীবনের একটা দিন না হয় সেখানেই কাটিয়ে আসুন।

জাদুঘর সমাজের দর্পণ, জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাঙ্গালী জাতির শেকড় সন্ধানে অর্থাৎ আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে। তৈরি করেছে জনগণের সাথে সেতু-বন্ধন। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি হাজার হাজার দর্শক জাদুঘর পরিদর্শন করে এদেশের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে জানতে পারছে।

মঙ্গলবার আমারও সুযোগ হয় ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জাদুঘরটি দর্শনের। সেখানে প্রায় সারাদিন কেটে যায়। তাই আপনাদের প্রতি পরামর্শ হল জাদুঘরটি ভালভাবে দেখতে চাইলে হাতে অনেক সময় নিয়ে যাবেন।

যা আছে জাদুঘরে:
১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের দ্বারোদঘাটন করা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন জাদুঘরটি এদেশের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক নিদর্শনাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও এ সংক্রান্ত গবেষণায় নিয়োজিত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান।

প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য তথা হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমানসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উপাদান, প্রত্ননিদর্শন, ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল নিদর্শন এ জাদুঘরের প্রধান আকর্ষণ।

ঐতিহাসিক নিদর্শনাদি, যেমন: প্রস্তর ও ধাতুর ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মুদ্রা, শিলালিপি, মধ্যযুগীয় অস্ত্রশস্ত্র, কারুশিল্প, নকশি কাঁথা, বাংলাদেশের গাছপালা, প্রাণি-পাখি ইত্যাদি প্রাকৃতিক নিদর্শন জাদুঘরের সংগ্রহ বা প্রদর্শনীতে রয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, দু’টি মিলনায়তন ও একটি অস্থায়ী প্রদর্শন কক্ষ রয়েছে। প্রায় ৮৬ হাজার নিদর্শনসমৃদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরটি চারতলা ভবনে ৪৪টি গ্যালারীতে ২০ হাজার বর্গমিটার জুড়ে বিস্তৃত।

জাতীয় জাদুঘরের সাতটি বিভাগের নাম পাওয়া যায়। সেগুলো হল:

  • ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগ,
  • জাতিতত্ত্ব ও অলঙ্করণ শিল্পকলা,
  • সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্ব সভ্যতা,
  • প্রাকৃতিক ইতিহাস,
  • সংরক্ষণ রসায়নাগার,
  • জনশিক্ষা এবং
  • প্রশাসন, অর্থ ও নিরাপত্তা বিভাগ।

বিভাগগুলোর অধীনে রয়েছে বিভিন্ন গ্যালারী। সবগুলো গ্যালারী দেখতে হলে অনেক সময় ও পরিশ্রমের দরকার হবে। অবশ্য ২৬ নম্বর গ্যালারীতে বিশ্রামের ব্যবস্থা আছে। কয়েকটি গ্যালারীর উন্নয়ন কাজ চলছে। তাই সেখানে কম সময় ব্যয় হবে।

ভাল লাগা কয়েকটি গ্যালারী:
প্রবেশ করা মাত্রই দেশের মানচিত্র প্রদর্শনী গ্যালারী। এরপর গ্রামীণ জীবন প্রদর্শনী। তারপরই আছে সুন্দরবন নামের গ্যালারী। প্রবেশ করা মাত্রই মনে হয়েছিল সুন্দরবনে প্রবেশ করলাম! সুন্দর করে সুন্দরবনের পরিবেশ ফুঁটে উঠেছে। যে কয়টি গ্যালারী খুব বেশি মনকে আকৃষ্ট করেছে তারমধ্যে এটি একটি।

পাখি গ্যালারীতে দেখলাম দেশের সবথেকে ছোট পাখি ফুলছুড়ি। জাদুঘরে না গেলে হয়তো এটি জানাই হত না!

১২ নম্বর গ্যালারীতে দেখেছিলাম অনেক ধরনের দেশীয় নৌকা। ১৩, ১৪ নম্বর গ্যালারীও মন কেড়েছে। উপজাতীয়দের জীবনধারা প্রদর্শিত হচ্ছে গ্যালারী দুটিতে।

এরপর অনেকগুলো গ্যালারী দেখতে দেখতে বস্ত্র ও পোষাক-পরিচ্ছদ নামক গ্যালারীতে দৃষ্টি আটকে যায়। সেখানে হরেক রকম পোষাক-পরিচ্ছদের সাথে দেখলাম মসলিন শাড়ি। বিশ্বখ্যাত মসলিন শাড়ি দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি! শাড়িটি বুননে যত মিহি হত তত মূল্য বেড়ে যেত। কথিত আছে, ২২ গজ একটি শাড়ি আংটির ভিতর দিয়ে কত সহজে প্রবেশ করতে পারে তার উপর মিহির হিসেব করা হত!

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন গ্যালারীতে জয়নুলের নানা রকম শিল্পকর্ম দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখলাম হাতের সময় প্রায় শেষ। ফিরতে হবে। কিন্তু ৩৮, ৩৯ ও ৪০ নম্বর গ্যালারী চোখে পড়ার পর আর ফিরতে ইচ্ছে করল না। সময় নেই তাতে কি? এই গ্যালারী সবথেকে বেশি সময় লাগে দেখতে।

তিনটা বিশাল কক্ষ নিয়ে গঠিত গ্যালারীটির নাম হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম: বাঙ্গালী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। এটি দর্শনের সময় আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতার ইতিহাস, যুদ্ধজয় ইত্যাদি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেখানে জেনেছি যুদ্ধের নানা ইতিহাস। তবে এই গ্যালারীর শেষটায় অজানা বদ্ধভূমি থেকে সংগৃহিত মাথার খুলি দেখে মনটা হঠাৎই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।

বাকি গ্যালারীগুলো যে ভাল লাগেনি তা বলছি না। সবগুলো সম্পর্কে লেখার ইচ্ছে থাকলেও লিখতে পারছি না। আমার মনে হয় স্বপরিবারে সবারই সেখানে যাওয়া উচিৎ। সেখানে ছোট-বড় সবার জন্যই রয়েছে জ্ঞানের ছড়াছড়ি।

যাবেন যেভাবে:
ঢাকার শাহবাগে যাওয়ার জন্য বলার কিছুই নেই। বিভিন্ন স্থান থেকে জাদুঘরের কাছ দিয়ে যাওয়া বাস চলে।

সময়সূচী:
কোথাও যেতে চাইলে সময়সূচী জানা খুবই জরুরী। অন্যথায় অনেক কষ্টে গিয়ে না দেখেই ফিরে আসা লাগতে পারে। তাই জেনে নিন সময়সূচী।

  • গ্রীষ্মকাল (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর): শনিবার - বুধবার সকাল ১০টা - বিকেল ৫.৩০ মিনিট। শুক্রবার বিকেল ৩টা - রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
  • শীতকাল (অক্টোবর-মার্চ): সকাল ৯.৩০মিনিট - বিকেল ৪.৩০মিনিট পর্যন্ত। শুক্রবার বিকেল ২.৩০মিনিট - রাত ৭.৩০মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে।
  • শেষ সময়ের ৩০ মিনিট আগেই টিকেট বিক্রি বন্ধ হয়। বৃহস্পতিবার এবং অন্যান্য সরকারি ছুটির বন্ধ থাকবে।

টিকেটমূল্য:
বাংলাদেশ ও সার্কভূক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ২০টাকা, বিদেশীদের জন্য ১০০ ও বার বছরের নিচের শিশুদের জন্য ২টাকা দিয়ে টিকেট করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের টিকেট লাগে না। ভিতরে হুইল চেয়ার পাওয়া যায়। ক্যামেরা ব্যবহার নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশের গৌরবময় সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে জাদুঘরটিতে যেতে পারেন। ব্যস্ত জীবনের একটা দিন না হয় সেখানেই কাটিয়ে আসুন। আরেকটি কথা, জাদুঘরের বাইরে এসে মাত্র তিন মিনিট হাঁটলেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমাধিসৌধ দেখতে পাবেন। সেটিও যেন মিস না হয়।

-
লেখক: চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)। 


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।