সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

singin-in-the-rain.jpg

সিঙ্গিন’ ইন দ্য রেইন

১৯২৭ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত হলিউড একের পর এক সব ক্লাসিকের জন্ম দিয়েছে। এ সময়কে বলা হয় গোল্ডেন এজ অব হলিউড। ১৯৫২ সালে নির্মিত সিঙ্গিন’ ইন দ্য রেইন তেমনই একটি ছবি। সিনেমাটির বিশেষত্ব এই যে, এটি 'গোল্ডেন এজ’এ নির্মিত ক্লাসিক এবং সে যুগের পক্ষ থেকে আগের যুগের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ।

১৯১০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে আমেরিকান সিনেমা বা হলিউডের সূত্রপাত হয়। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন ইউরোপে সিনেমা নির্মাণ বন্ধ ছিল, সেই সুযোগে হলিউড যথেষ্ট বিকাশের সুযোগ পায়। শুরুতে ছিল নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগ। এরপর ১৯২৭ সালে সবাক চলচ্চিত্র এসে নতুন যুগের সূচনা করে। ততদিনে হলিউড যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সিনেমায় নিজেদের একটি স্বতন্ত্র বাচনভঙ্গি সৃষ্টি করে ফেলেছে। ১৯২৭ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত হলিউড একের পর এক সব ক্লাসিকের জন্ম দিয়েছে। এ সময়কে বলা হয় গোল্ডেন এজ অব হলিউড। তবে নির্বাক থেকে সবাক সিনেমায় যাওয়ার সময়কালটিই ছিল সবচেয়ে সঙ্কটপূর্ণ। অনেক প্রতিভাবান অভিনয়শিল্পী ভাল কন্ঠশৈলির অভাবে ঝড়ে পড়েন। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে হঠাৎ করেই অমসৃণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসময়কে পটভূমি করে অনেক সিনেমাই তৈরি হয়েছে। তবে কালের নির্মম স্রোতে টিকেছে সামান্যই। ১৯৫২ সালে নির্মিত সিঙ্গিং ইন দ্য রেইন বা আমেরিকান উচ্চারণে সিঙ্গিন’ ইন দ্য রেইন তেমনই একটি ছবি। সিনেমাটির বিশেষত্ব এই যে, এটি গোল্ডেন এজ’এ নির্মিত ক্লাসিক এবং সে যুগের পক্ষ থেকে আগের যুগের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ।

ছবির কাহিনী ডন লকউড নামের এক হলিউড হার্টথ্রবকে নিয়ে। একটি ছবির প্রিমিয়ার শোতে দর্শকের অনুরোধে লকউডকে তার সাফল্যের গল্প বলতে হয়। তার গল্পে সবচেয়ে গুরুত্ব পায় তার সর্বক্ষণের বন্ধু কসমো ব্রাউন। ডন প্রথমে মিউজিশিয়ান ছিল, তারপর স্টান্টম্যান হিসেবে কাজ করার পর নায়কের চরিত্র পায়। স্টুডিওর পরামর্শে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য নায়িকা লিনা ল্যামন্টের সাথে তার প্রেমের গুজব ছড়ানো হয়। লিনা আবার ইচ্ছাকৃত ছড়ানো গুজবটি বিশ্বাস করে ডনকে নিজের প্রেমিক মনে করে। প্রিমিয়ার শেষে প্রযোজকের পার্টিতে যাওয়ার সময় ক্যাথি সেলডেন নামের এক মঞ্চ অভিনেত্রীর সাথে পরিচয় হয়। ক্যাথি মনে করে, সিনেমার অভিনয় প্রকৃত অভিনয় নয় এবং কারও একটি সিনেমা দেখা মানে সব দেখে ফেলা। ডন প্রতিবাদ করলেও তার আত্মবিশ্বাসের ভিত নড়ে যায়। সেদিনের পর থেকে ডন লকউড ক্যাথিকে খুঁজতে থাকে। একদিন পেয়েও যায়। তাদের কথা হলে ডন জানতে পারে, ক্যাথি তার অভিনয়ের মুগ্ধ ভক্ত। তার কোন ছবি, এমনকি পত্রিকার স্ক্যান্ডালও সে বাদ দেয় না। আগের দিন ইচ্ছা করেই ডন সম্পর্কে ওভাবে কথা বলেছিল সে। আর ক্যাথির সংস্পর্শে এসে ডনও গতানুগতিক অভিনয়ের বাইরে এসে ভাবতে শুরু করে। তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়।

ইতোমধ্যে ইন্ডাস্ট্রিতে যুগান্তর সৃষ্টিকারী সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। ডন লকউডের বিখ্যাত ছবি ডুয়েলিং ক্যাভেলিয়ারকে সবাক করে তৈরির কথা ভাবে তারা। এতে লিনা ল্যামন্টের কন্ঠের দূর্বলতা, মাইক্রোফোনের সাথে অভিনয়ের ব্যর্থতায় পরিচালক, প্রযোজক তাকে নিয়ে বিপদে পড়ে যায়। সাউন্ড রেকর্ডিং এবং প্রিমিয়ারের সময় লিনাকে নিয়ে হাসির রোল পড়ে যায়। ডন, কসমো এবং ক্যাথি চিন্তা করতে থাকে কী করা যায়। শেষে সিদ্ধান্তে আসে, সিনেমাটিকে মিউজিক্যাল বানাবে, নাম হবে ড্যান্সিং ক্যাভেলিয়ার এবং লিনার কন্ঠ ক্যাথিকে দিয়ে ডাবিং করা হবে। কিন্তু এসব করতে হবে লিনাকে না জানিয়ে। ডন এবং ক্যাথির প্রেম ঘনীভূত হয়। ডনের প্রেমে পড়াকে চিত্রিত করা হয় বিখ্যাত সিঙ্গিন’ ইন দ্য রেইন গানের মাধ্যমে।

ছবির ডাবিং শেষ হওয়ার আগেই লিনা সব জেনে গিয়ে স্টুডিও মালিক আর. এফ. কে মামলার হুমকি দেয় এবং ক্যাথির ক্যারিয়ার ধ্বংসের চেষ্টা করে। কিন্তু শেষে উৎসাহী দর্শকের সামনে ডন ফাঁস করে দেয় ক্যাথির কন্ঠের কারণেই শেষ পর্যন্ত ড্যান্সিং ক্যাভেলিয়ার ভাল ছবি হয়ে উঠেছে। ডন এবং ক্যাথির প্রেম দিয়ে শেষ হয় ক্লাসিক এই ছবিটি।

শিল্পীর জীবন নিয়ে শিল্পিত ছবি সিঙ্গিন’ ইন দ্য রেইন। ডন লকউডের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জীন কেলি। তিনি এবং স্ট্যানলি ডোনেন সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন। ছবির শুরুতে ডন লকউডের জীবনের গল্পে একজন সত্যিকারের শিল্পীর সংগ্রাম দেখানো হয়েছে। কোন কিছুতেই না ছিল না তার। আর ফ্ল্যাশব্যাকে তার গল্প বলার দৃশ্যায়নটি হাস্যরসাত্মক এবং যুগের তুলনায় অনেক অগ্রসর। সিনেমা জগতের অনেক নির্মম সত্য রসিকতার ছলে দেখানো হয়েছে এতে। ফিল্ম অভিনেতাদের দেখার জন্য মানুষের উগ্র আকাঙ্খা, বাকি কলাকুশলীদের প্রাপ্য প্রশংসাটুকুও না পাওয়া, নায়কদের মনোমুগ্ধকর হওয়ার কৃত্রিম চেষ্টা, মঞ্চ অভিনয়–সিনেমা অভিনয়ের দ্বন্দ্ব সবই উঠে এসেছে এতে। একটা প্রেমের দৃশ্য করার সময় ডন এবং লিনার ঝগড়া চলছিল, কিন্তু তার মধ্যেও তাদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। সবাক ছবির যুগে আগের যুগের অনেক গুণী শিল্পী বাদ পড়ে যায়।

১০৩ মিনিটের সিনেমাটিতে মোট ১৩টি গান ছিল। গানগুলোর বেশিরভাগই আগেকার সিনেমা থেকে সংগৃহিত হলেও এগুলোর দৃশ্যায়ন অভূতপূর্ব। Fit as a fiddle গানের সাথে দ্বৈত নাচ পরিবেশনের অনন্য মাত্রা দেখা যায়। নাচটি অ্যাক্রোবেটিক এবং কিছুটা হাসি উদ্রেককারী। কসমো চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডোনাল্ড ও’কনর। Make ‘em laugh গানটিতে তিনি অসংখ্য রকমের মুখভঙ্গি করেছেন যা কার্টুন ছবি ছাড়া সম্ভব নয় বলেই মনে হচ্ছিল, আর সাথে অদ্ভুতুড়ে ডিগবাজি খাওয়া নৃত্যশৈলি তো আছেই। ও’কনর মারাত্মক ধূমপায়ী ছিলেন। শ্রমসাধ্য এই নাচের শ্যুটিংয়ের পর তাঁকে অসম্ভব ক্লান্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। গানটিতে শিল্প সম্পর্কে কিছু অব্যর্থ কথা আছে – সমালোচকদের যা আনন্দ দেয়, শিল্পীকে তা অভুক্ত রাখে; চটকদার, সস্তা হাসির উপাদান মানুষকে আনন্দ দেয় বেশি। You Were Meant for Me গানটিতে সিনেমার সেট নির্মাণ বিষয়ে অনেক ধারণা পাওয়া যায়।

ক্যাথি চরিত্রে ডেবি রেনল্ডস অভিনয় করেছেন। সেসময় তাঁর বয়স ছিল ১৯ বছর। নাচ না জানার কারণে জীন কেলি তাঁকে অপমান করায় তিনি স্টুডিওতে একটা পিয়ানোর আড়ালে বসে কাঁদছিলেন। এসময় ফ্রেড অ্যাস্টায়ার তাঁকে দেখতে পান এবং সব জানার পরে তাঁকে নাচ শিখতে সাহায্য করেন। Good Mornin’ গানের সাথে নাচের পর রেনল্ডসের পা রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। অনেক বছর পরে তিনি জানিয়েছিলেন, সিঙ্গিন’ ইন দ্য রেইন-এ অভিনয় এবং সন্তান জন্মদান তাঁর জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর অভিজ্ঞতা।

পরিচালক এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করা ছাড়াও জীন কেলি নাচের কোরিওগ্রাফও করেছেন। সিনেমাটির কিংবদন্তীতুল্য শিরোনাম গান Singin' in the Rain এর দৃশ্যায়নে নাচেন তিনি। নতুন প্রেমে পড়ার আনন্দে বৃষ্টির মধ্যে ডন লকউডের অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে এ নাচে। এসময় তাঁর ছিল ১০৩ ডিগ্রী জ্বর। এরমধ্যে বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্যে ২-৩ দিন ধরে শ্যুটিং করেন তিনি। Broadway Melody gotta dance’ গানের দৃশ্যায়নে বিশাল একটি দল অংশ নেয়। এ গানের মাধ্যমে একটি সুন্দর কাহিনীও বর্ণিত হয়েছে। এক যুবক নৃত্যশিল্পী শহরে কাজের খোঁজে আসে। কাজকে নেশা হিসেবে নেয় সে। সহসা এক সুন্দরী নারীর প্রেমে পড়ে যায়। সে প্রেম কিছুটা জমে উঠতেই এক ধনী ব্যক্তি অর্থ দিয়ে মেয়েটিকে মুগ্ধ করে নিয়ে যায়। যুবক কালে কালে অনেক বড় শিল্পী হয়। দুনিয়াজোড়া তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, ধনী হয় সে। হঠাৎ অনেকদিন পর তার ভালবাসার মেয়েটির দেখা পায়। এক নিমেষে স্বপ্নের জগতে চলে যায় সে। এ অংশটির দৃশ্যায়নও স্বপ্নের মত। আর নাচের মুদ্রাগুলো চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বাস্তবে ফিরে এসে সে দেখে, অর্থের ঝনাৎকারের ভাষা শিখে গেছে মেয়েটিও। তাই জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ শিল্পকেই বেছে নেয় নৃত্যশিল্পী। জীন কেলি পুরো সিনেমাজুড়ে গান, নাচ, অভিনয় সব কলায় অভিভূত করে রেখেছেন।

প্রায় ২.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে নির্মিত এই ছবিটি আমেরিকা ও কানাডায় ৩ মিলিয়ন এবং বাকি বিশ্বে ২ মিলিয়নের বেশি আয় করে। সমালোচকদের মন জয় করা এই ছবিটি বড় কোন পুরষ্কারই পায় নি। দুটি বিভাগে অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছে, ডোনাল্ড ও’কনর গোল্ডেন গ্লোবে সেরা অভিনেতার পুরষ্কার পেয়েছেন। এছাড়া কয়েকটি আসরে মনোনয়নও পেয়েছে ছবিটি। তবে এর মূল সাফল্য বাণিজ্যে বা পুরষ্কার প্রাপ্তিতে নয়। রটেন টোমাটোর হিসাবে, ফিল্মটি এখনো ১০০% সজীব, যা অনেক ভাল ভাল ছবির কপালেও জোটে না। ৮.৪ রেটিং পেয়ে আই.এম.ডি.বি’র শীর্ষ ২৫০ ছবির তালিকায় এর অবস্থান ৮৫। আর তার চেয়েও নির্ভরযোগ্য আমেরিকারন ফিল্ম ইন্সটিট্যুট বা এ.এফ.আইয়ের ২০০৭ সালের তালিকায় গত শতাব্দীর সেরা ১০০ মুভির তালিকায় এর অবস্থান ৫ম। তাদের সেরা মিউজিক্যাল মুভির তালিকায় এটি শীর্ষে, কমেডি হিসেবে ১৬তম। সিনেমার সেরা ১০০ গানের মধ্যে এর তিনটি গান আছে।

ষাট বছর ধরে অটুট জনপ্রিয়তা ধরে রাখা ছবিটি পরের অনেক চলচ্চিত্রকে উৎসাহিত করেছে। ২০১১ সালের অস্কার বিজয়ী দ্য আর্টিস্টের অংশবিশেষ এর দ্বারা অনুপ্রাণিত। সিঙ্গিন’ ইন দ্য রেইন একই সাথে কমেডী, আবেগ, গান, নাচ ও প্রেমের ছবি। কাহিনীর ভাঁজে ভাঁজে পাত্র পাত্রীর প্রেম কাহিনীর গতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। প্রেমের সাথে সঙ্গীত ও নাচের যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কটি আছে, সিনেমাটি তাই বার বার মনে করিয়ে দেয়। শিল্পীজীবনের নানা দিকের ছবি নিরন্তর আমাদের মনে এঁকে চলে সিনেমাটি।
এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।