সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

Ahsan-Manzil-Dhaka.jpg

ঘুরে আসুন পুরনো ঢাকার ঐতিহ্য আহসান মঞ্জিল জাদুঘর

বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে পুরনো ঢাকার ইসলামপুর এলাকায় আহসান মঞ্জিল অবস্থিত। অনবদ্য অলঙ্করণ সমৃদ্ধ সুরম্য এ ভবনটি ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন।

গত কয়েকদিন ধরে ঢাকার গুলিস্তানে আসা যাওয়া করছি। ঐতিহাসিক কোন স্থাপনার নাম শুনলেই সেখানে ছুটে চলার আলাদা একটা আকর্ষণ মনের মাঝে উঁকি দেয়। গুলিস্তান থেকে খুবই কাছাকাছি স্থাপনাগুলোর মাঝে ইতোমধ্যেই লালবাগ কেল্লা, হোসেনী দালান দর্শন করেছি। সুতরাং সুযোগ পেয়ে আহসান মঞ্জিলও দেখলাম।

পটভূমি:
বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে পুরনো ঢাকার ইসলামপুর এলাকায় আহসান মঞ্জিল অবস্থিত। এটি ব্রিটিশ ভারতের উপাধিপ্রাপ্ত ঢাকার নবাব পরিবারের বাস ভবন ও সদর কাচারি ছিল। অনবদ্য অলঙ্করণ সমৃদ্ধ সুরম্য এ ভবনটি ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন।

উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের প্রথমদিকে উপমহাদেশের, বিশেষ করে বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আহসান মঞ্জিলেই গৃহিত হয়েছে। ঢাকার নওয়াবদের দানে সর্বপ্রথম ফিল্টার শোধিত পানি সরবরাহ ও বিদ্যুতায়ন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে আধুনিক ঢাকার গোড়াপত্তন ঘটে। দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ এ ভবনে নওয়াবদের আতিথ্য গ্রহণ করতেন। এ সব কারণে ইতিহাসে আহসান মঞ্জিল বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।

আহসান মঞ্জিলের সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন ও জাদুঘরে রুপান্তর শীর্ষক প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরম্ভ হয় ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসে। ১৯৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত হয়।

আহসান মঞ্জিলের ইতিহাস:
আঠার শতকের প্রথমদিকে জালালপুর পরগণার (বর্তমান ফরিদপুর-বরিশাল) জমিদার শেখ ইনায়েতউল্লাহ আহসান মঞ্জিলের স্থানে এক বাগান বাড়ি তৈরি করেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র শেখ মতিউল্লাহ সেটি ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করেন। তখন ফরাসিরা সেখানে বাণিজ্যকুঠি নির্মাণ করেন। 

১৮৩০ সালে খাজা আলীমুল্লাহ কুঠিটি ক্রয় পূর্বক নিজ বাসভবনের উপযোগী করেন। ১৮৬৯ সালে নওয়াব আবদুল গণি প্রাসাদটি পুনঃনির্মাণ করে প্রিয় পুত্র খাজা আহসানুউল্লাহর নামানুসারে নামকরণ করেন আহসান মঞ্জিল

১৮৮৮ সালে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পুরো মঞ্জিলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরবর্তীতে পুনঃনির্মাণের সময় উঁচু গম্ভুজটি সংযোজন করা হয়। সে আমলে এটিই ছিল ঢাকার সবথেকে উঁচু ও জাঁকালো ভবন। শহরের অন্যতম উঁচু চূড়া হওয়ায় তা বহুদূর থেকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতো।

উনিশ শতকে ঢাকায় নির্মিত ইমারতের মধ্যে আহসান মঞ্জিল সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার দিকে প্রাকৃতিক দৃশ্য শোভিত প্রাসাদের মনোরম অঙ্গন বিস্তৃত। সমগ্র মঞ্জিলটি দুটি অংশে বিভক্ত।

  • পূর্বপার্শ্বের গম্ভুজযুক্ত অংশকে বলা হয় প্রাসাদ ভবন (রঙমহল) এবং
  • পশ্চিমাংশের আবাসিক প্রকোষ্ঠাদি নিয়ে নির্মিত ভবনকে বলা হয় অন্দরমহল। বর্তমানে এটি অফিসরুম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ।

প্রাসাদ ভবনটি দুটি সুষম অংশে বিভক্ত। মাঝখানে গোলাকার কক্ষ আছে। এর উপরেই অষ্টকোণ বিশিষ্ট উঁচু গম্ভুজটি অবস্থিত। পূর্বাংশে দোতলায় বৈঠকখানা, গ্রন্থাগার, কার্ডরুম ও তিনটি মেহমান কক্ষ এবং পশ্চিমাংশে একটি নাচঘর, হিন্দুস্থানী কক্ষ এবং কয়েকটি আবাসিক কক্ষ রয়েছে। নিচ তলায় পূর্বাংশে আছে ডাইনিং হল, পশ্চিমাংশে বিলিয়ার্ড কক্ষ, দরবার হল ও কোষাগার।

রঙমহলের ৩১টি কক্ষের ২৩টি প্রদশর্নীর জন্য উন্মুক্ত। ৯টি কক্ষ লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীতে প্রাপ্ত এবং মি. ফ্রীৎস কাপ কর্তৃক ১৯০৪ সালে তোলা আলোকচিত্রের সাথে মিলিয়ে সাজানো। মঞ্জিলের তোষাখানা ও ক্রোকারিজ কক্ষে থাকা তৈজসপত্র এবং নওয়াব এস্টেটের পুরনো অফিস এডওয়ার্ড হাউস থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে ক্রয়কৃত সমসাময়িককালের তৈজসপত্র। এ যাবৎ সংগৃহিত নিদর্শন সংখ্যা ৪০৭৭ টি।

সময়সূচী:

  • গ্রীষ্মকাল (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর): সকাল ১০.৩০ - বিকেল ৫.৩০ মিনিট। শুক্রবার: বিকেল ৩টা - রাত ৮টা পর্যন্ত।
  • শীতকাল (অক্টোবর-মার্চ): সকাল ৯.৩০ - বিকেল ৪.৩০ মিনিট পর্যন্ত। শুক্রবার: বিকেল ২.৩০ - রাত ৭.৩০ মিনিট পর্যন্ত।
  • বৃহস্পতিবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন জাদুঘর বন্ধ থাকে।

টিকেট:
প্রবেশপথে ২০টাকা মূল্যে টিকেট ক্রয় করতে হবে। পূর্ব থেকে আবেদন করলে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে দেখার সুযোগ পায়। গ্যালারীতে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই গ্যালারীতে প্রবেশকালে কর্তৃপক্ষ চাইলে ক্যামেরা জমা দিতে হবে। তবে গ্যালারীর বাইরে ছবি তোলা নিষেধ নয়।

যেভাবে যাবেন:
গুলিস্তান বঙ্গবাজার, নয়াবাজার মোড়, বাবুবাজার কিংবা সরাসরি ইসলামপুর যাবেন। এ সব স্থান থেকে রিকশায় যেতে হয়। খুবই সরু রাস্তা হওয়ায় গাড়ি যায় না।

জাদুঘর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। আনন্দ, অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস জানতে জাদুঘরটি পরিদর্শন করতে পারেন।

সূত্র: জাদুঘর ও প্রদর্শনীর তথ্য সম্বলিত পরিচিতি (পুস্তিকা)।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।